শনিবার, ১৩ জুন, ২০২০

কথাঃ আবোলতাবোল (ভালো থাকুক শিশুরা)


কথাঃআবোলতাবোল   

 

    ভালো থাকুক শিশুরা      

                                                  

 

খবরে প্রকাশ, শিগগির খুলছে না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাত্রছাত্রীদের বন্দী জীবন বহাল থাকছে জুনের পরেও  অনির্দিষ্টকাল। এ অবস্থায় পরিবার তথা জাতির ভবিষ্যতদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছেবয়সে যারা একটু বড়,তারা হয়ত কিছুটা মানিয়ে নিতে পারে এই অবস্থার সঙ্গে। কিন্তু এই দীর্ঘ বন্দীজীবন প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থী-শিশুদের কাছে বেশ কষ্টের

 এমনিতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে অনেক পরিবার এখনও কর্মসহায়িকার সাহায্য থেকে বঞ্চিত। সেখানে, একে তো করোনায় কী হবে তাই  নিয়ে দুশ্চিন্তা,তার উপর বাবা মা দুজনেই জেরবার ঘরের কাজ  করতে গিয়ে তাঁদের বিরক্তির গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী, নিজেদের মধ্যে ঝগড়া,অশান্তিও কমবেশি লেগেই রয়েছে এর উপর বাড়ির শিশুর চাঞ্চল্য, দুষ্টুমি সামলানো সহজ কথা নয়

বাড়িতে শিশুদের সামলাতে  এইসব পরিবারে এখন তাই তিনটিই প্রধান রাস্তা এক, শাসন  (যার   মধ্যে প্রহার একটা বড় অংশ)দুই,পড়াশোনায় শিশুকে ব্যস্ত রাখা তিন, একালের শিশুর প্রধান চাহিদার  কাছে নতি স্বীকার করে গেম খেলার জন্য মোবাইলটা বাড়িয়ে দেওয়া অথবা টিভিতে দীর্ঘক্ষণ কার্টুন দেখতে অনুমতি দেওয়াশিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য এগুলো কোনওটাই যে ঠিক নয়, উপরন্তু যথেষ্ট ক্ষতিকারক তা  বলার অপেক্ষা রাখে না

বন্দীজীবনে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে ডাক্তার বা মনোবিদেরা অনেক দাওয়াই দিচ্ছেন সেগুলো তো রইলই,সঙ্গে আরও কিছু প্রস্তাব অভিভাবকেরা ভেবে দেখতে পারেন

আমাদের ছেলেবেলায় যখন টিভি ছিল না,মোবাইল ছিল না,এমনকী অনেকবাড়িতে পাঁজি ছাড়া পড়ার বইয়ের বাইরে কোনও বইও থাকত না,তখন লাগাতার বর্ষাবাদলে গৃহবন্দী হয়ে আমরা বেশ কিছু খেলা খেলতাম নিজেদের মধ্যে এই খেলাগুলো যেমন আনন্দদায়ক,তেমনি মানসিক স্বাস্থেরও অনুকূল

এইসব খেলার একটা ছিল দেখাদেখির খেলাএটা শুরু হত এইভাবে, একজন  চারিদিক তাকিয়ে নিয়ে বলে উঠত, ‘আমি যা দেখি,তুই তা দেখিস? আমি দেখছি একটা প্রজাপতিবলেই সে এক দুই তিন করে দশ গুনতে থাকত সহখেলোয়াড়টি সঙ্গে  সঙ্গে তাকাত আশে পাশে প্রজাপতিটি তাকে দেখাতে হবে প্রতিপক্ষের দশ গোনার মধ্যে পেরে গেলে তার দান আর না পারলে,এক পয়েন্টে পিছিয়ে আবার  প্রতিপক্ষের চ্যালেঞ্জের সামনে

এরকমই আর একটা খেলা ছিল, ‘আপ,ডাউনএই খেলায় রাস্তার ধারের জানলায় বসত দুজন রাস্তার একটা দিক আপ, আর একটা দিক ডাউন দুজনের হাতেই থাকত দুটো কলম,আর কাগজ ঘড়ি মিলিয়ে বসা হত পনেরো মিনিট সময় ওই সময়ে আপ থেকে কজন মানুষ এল,ডাউন থেকে কজন মানুষ এল, দুদিকের দুজন কাগজে লিখত এক দুই করে পনেরো মিনিট পরে আবার সাইড চেঞ্জ আবার গোনা এবার হিসাবের পালা যার বেশি স্বভাবতই সে বিজয়ী

ছুটির দিনের আর একটি মজার খেলা ছিল,’তুই কত,মুই কতএখানে তৃতীয় একজন,দুই খেলোয়াড়েরই  অসাক্ষাতে,গুলি পেনসিল পুতুল কাঁচি মিলিয়ে খান পনেরো জিনিস ফাঁকা মেঝেয় রাখত এরপর  দুজনকে   ডেকে মিনিট খানেক দেখতে দেওয়া হত জিনিসগুলো দুজনের হাতেই দেওয়া হত কাগজ আর পেন আলাদা আলাদা জায়গায় গিয়ে দুজনে লিখত সেগুলোর নাম এই লেখার জন্যও সময় থাকত সময় শেষ হতেই নিয়ে নেওয়া হত কাগজ দেখা হত,কে কটা লিখতে পেরেছে

তখনকার সাময়িক গৃহবন্দীত্বে অথবা ছুটির দিনে শিশুদের এই খেলাগুলো নিজেদের মত করে আবার  এখন চালু করাই যায় পরিবারে দুটি শিশু না থাকলে বাবা অথবা মা যে কেউই হয়ে যেতে পারেন সহ খেলোয়াড় বলা যায় না এতে বাবা মারাও নিজেদের জন্য কিছুটা বাড়তি অক্সিজেন পেয়ে যেতে  পারেন

বাড়ির শিশুটিকে নিয়ে সবসময় এইসব খেলায় মেতে থাকা নিশ্চয়ই অসম্ভব তার দরকারও নেই অভিভাবকেরা যখন ব্যস্ত,তখন  শিশুদের নিয়োজিত করা যেতে পারে কিছু অন্যরকম কাজে আজকাল   বেশিরভাগ বাড়িতে (সে বাড়ি ফ্ল্যাট হলেও) টবে ফুলগাছ একটা সাধারণ দৃশ্য ঘরের শিশুটিকে এসময় একটি বা দুটি ফুলগাছে জল দেওয়ার কাজে নিয়োজিত করা যেতে পারে এ ছাড়া মোবাইল যদি তাকে দিতেই হয়, দেওয়া যেতে পারে এই সময়টাতেই তবে গেম খেলার জন্য নয় ইউটিউব দেখে কাগজের ফুল,পাখা,নৌকো কীভাবে তৈরি করা হচ্ছে তা শেখা এবং প্রয়োগের জন্য একটা কাঁচি,কিছু রঙিন কাগজ দিয়েদিলেদিয়ে দিলে সে কিন্তু খুশিমনেই এ কাজ করবে। কেননা, কাঁচি দিয়ে কাগজ কাটতে প্রতিটা শিশুই ভালোবাসে

আঁকার কাজ শিশুরা করেই থাকে এই সুযোগে তাকে লাগিয়ে দেওয়া যেতে পারে নতুন কোনও দৃশ্য বা ফলফলারি আঁকার কাজে নিয়মের বাইরে যে কোনও জিনিসেই শিশুর উৎসাহ এরকম আঁকার কাজ দিলে হয়ত সে খুশি মনেই সেটা করবে

মাঠ নেই,ছাদ তো আছে বিকালের দিকে ছাদের উপর শিশুকে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে মাটি না  পাক,আকাশ  দেখলেও কিন্তু মন ভালো হয়ে যায় সরে যায় মনের মেঘ রাতে ওই ছাদেই বাড়ির খুদেটির জন্য পরিবারের সবাইকে নিয়ে,গুগুলকে সাথী করে বসানো যেতে পারে আকাশ চেনার আসর

পরিবারের বাইরে শিশুর পছন্দের জন কে তা বাবা মার অজানা নয়মোবাইলে সেই পছন্দের জনটিকে ধরে মাঝে মাঝে কথা বলার সুযোগ করে দিলে শিশু খুশি হবে। এছাড়া কার্টুনের নেশা কাটাতে ছোটদের বই ইউটিউব থেকে খুঁজে দু তিনদিন অন্তর দেখানো যেতে পারে শোনানো যেতে পারে তাদের উপযোগী কোনও ভাল অডিও গল্প

স্কুলে বন্ধুদের সঙ্গে টিফিনে হুল্লোড়, বিকেলে সবুজ মাঠে খেলার সাথীদের সঙ্গে কলরব, কিম্বা মা বাবার সঙ্গে শপিংএ বেরিয়ে পছন্দের আইসক্রিম খাওয়া,কোনওটারই হয়ত বিকল্প হয় না তবু শিশুকে ভাল রাখতে হবে যে কোনও উপায়ে চেষ্টা করতেই হবে নানাভাবে যাতে এই বন্দীজীবন তার কাছে দুর্বিষহ না হয়ে ওঠে

 


কথাঃআবোলতাবোল( 'ও বক বকম বকম পায়রা...')



  কথাঃআবোলতাবোল

  


বক বক্ বকম পায়রা…’

 

ঝিনেদার জমিদার কালাচাঁদ রায়রা/সে-বছর পুষেছিল একপাল পায়রাছেলে পড়ছে পাশে বসে আমি ছেলের পড়া শুনছি আর আমার সামনে ভেসে উঠছে একটা ছবি শুধু ছবি নয়,সঙ্গেআও,আও,আওশব্দও পঞ্জাবের সবুজ শস্য প্রান্তরের মাঝখানে এক চিলতে খালি জায়গা সেখানে ভিড় করে আছে অজস্র পায়রা তাদেরআও আওশব্দে দানা খাওয়াচ্ছেন চৌধুরী বলদেব সিংহ,আর ঠিক তাঁর পাশেই একই  ভঙ্গিতে পারিবারিক বন্ধুর ছদ্মবেশে সিমরণের প্রেমিক রাজ দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে যায়েঙ্গেছবি দেখেছি আজকে নয় কিন্তু  এক ঝাঁক পায়রার কথা  শুনলে ওমরেশপুরি আর শাহরুখের এই দানা খাওয়ানোর দৃশ্যটা আজও চোখের সামনে ভেসে ওঠে

জগদানন্দ রায়েরবাংলার পাখিবইতে কপোত প্রজাতির পাখির প্রথমেই রয়েছে পায়রা তবে লেখক শুরুতেই বলে দিয়েছেন,পায়রা যেহেতু বাড়িতে আমরা অনেকে পুষি,তাই এই পাখি নিয়ে বেশি কথা  বলবেন না শুধু পোষা নয়,মানুষের সঙ্গ প্রিয় এই পাখি আমাদের প্রতিদিনের চলাফেরায় এতটাই জড়িয়ে আছে যে আলাদা করে এর দেহের বর্ণনা দেওয়া সত্যিই অনাবশ্যক

শোনা যায় পৃথিবীতে ২০০ জাতের পায়রা আছে এর মধ্যে দুই বাংলা জুড়ে ছড়িয়ে আছে ৩০ জাতের পায়রা ঝিনেদার জমিদারদের পায়রা কোন জাতের?‘ বড়বাবু খাটিয়াতে বসে বসে পান খায়,/পায়রা  আঙিনা জুড়ে খুঁটে খুঁটে ধান খায়পড়া শুনতে শুনতে সেই বহুযুগের ওপার থেকে এসে হাজির হয়,আমার ক্লাস ফোরপঁচিশ গন্ডা পায়রা নিয়ে/আমার যে কি হয়রানি এ…’ সারা সকাল চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে মুখস্থ করার পরও,যদু মাস্টার ক্লাসে সেদিন বিপাকে ফেলে দিয়ে ছিলেন আমাকে  

-‘ তুইপণ্ডশ্রমকবিতার সারাংশটা বল

-‘সারাংশ! আমি তো…’

-‘আমি তো শুধু কবিতাটা মুখস্থ করেছি,তাইতো?কান ধরে দাঁড়িয়ে থাক বাঁদর!’

-‘বাবা ভুটকি আর ছুটকি তো আসে না আর!’ ‘পায়রা জমায় সভা বক বক বকমেশেষ করেই ছেলে  তাকায় আমার দিকে

ভুটকি আর ছুটকি আমাদের দুই প্রিয় পায়রা পোষা নয়,কিন্তু পোষ্যের মতই তাদের আচরণ ফ্ল্যাটের বাঁদিকের ঘরের পুবমুখো জানলাটা খুললেই প্রতি সকালে ওরা টুকি দেয় বিস্কুট মুড়ি দিই,খুঁটে খুঁটে খায় কিন্তু করোনা পর্বে ও জানলা আর খোলাই হয় না এই লকডাউনেও ওদিকের প্রতিবেশির লাগোয়া ছাদে নিত্যদিন মিস্ত্রি লেগেই আছে কোথা থেকে কী হয়,ভেবে ও জানলা বন্ধই থেকে যায় সারাদিন

-‘ভুটকি,ছুটকিকে দেখলে চিনতে পারবি?’

-‘কেন পারব না? আমি যে একদিন ওদের দুজনের পিঠেই আলতা ঢেলে দিয়েছিলাম

আলতা ঢেলে দেওয়ার কথায় মনে পড়ল পাকিস্তানের নারোয়ালের হাবিবুল্লার কথা এবছর ইদের দিন বেচারি তাঁর পোষা বারোটা পায়রা উড়িয়েছিলেন আকাশে কিন্তু সব কটা ফেরত এলেও এলনা একটি  সীমান্ত পার হয়ে চলে এল এদেশে   জম্মুকাশ্মীরের কাঠুয়া জেলার সীমান্তসংলগ্ন এক গ্রামে পায়রাটা ধরা পড়ে গেল মে মাসের চব্বিশ তারিখ গায়ে গোলাপি রঙ ঢালা,পায়ে রিং, সেখানে কিছু সাংকেতিক চিহ্ন লেখা এতো যে সে পায়রা নয় এ নিশ্চয় পাকিস্তানি চর এর আগেও পায়রাকে চরের কাজে লাগিয়েছে পাকিস্তান পুলিশ নিজেদের হেফাজতে নিল পায়রা্টিকে এরপর আসল তথ্য ভেসে এল ওপার থেকে জানা গেল,যাকে সাংকেতিক চিহ্ন ভেবেছে পুলিশ,তা আসলে হাবিবের ফোন নম্বর পায়রা হারিয়ে গেলে তা ফিরে পাবার জন্যই হাবিবের এই সাবধানতা হাবিব তাঁর প্রিয় পায়রাটির জন্য সংবাদমাধ্যমের সাহায্যে সরাসরি আমাদের প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে আবেদন জানালেন সবকিছু খতিয়ে দেখে পায়রাটিকে মুক্তি দেওয়া হল ২৮ মে

করোনা সংবাদের পাশে এ খবরটিও গত মাসে শিরোনামে উঠে এসেছিল অনেক কাগজেই পায়রা খবরের শিরোনামে কিন্তু গত বছরেও এসেছিল একবার আর্মান্দোর কথা হয়ত অনেকেরই মনে পড়বে গতবছর বেলজিয়ামের পাঁচবছর বয়সী এই পায়রাটিকে নিয়ে বেশ হইচই হয়েছিল কাগজে। কারণ নিলামে এই পায়রার দাম উঠেছিল ভারতীয় মুদ্রায় দশ কোটি টাকা নিলাম থেকে,দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দেওয়ার ক্ষমতা সম্পন্ন পায়রাটিকে কিনে নিয়েছিলেন চিন দেশের এক নাগরিক

পায়রা যেমন শান্তির প্রতীক,তেমনি জোড়া পায়রা প্রেমেরও প্রতীক সলমন খানের প্রথম ছবি, 'ম্যায়নে পেয়ার কিয়ামনে আছে? পায়রা যে এককালে ডাকপিওনের কাজ করত তা আবার দেখা গেল এই ছবিতে ভাগ্যশ্রীর চিঠি সলমনের কাছে পৌঁছে দিত এক শ্বেত কবুতর ভারি মনোহর সে দৃশ্য সঙ্গে সেই গান, ‘যা যা যা কবুতর

সিনেমায় গানের কথা যখন উঠল তখন বাংলামায়ামৃগছবিতে সন্ধ্যারায়ের লিপে শ্যামল গুপ্তের লেখা,সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের সেই, অবিস্মরণীয় গানও বক বকম বকম পায়রা /তোদের রকম সকম দেখে…’কে ভুলতে পারবে!

ঝিনেদার জমিদারদের পায়রা পোষার ছড়া আমরা ছেলেবেলায় কোনও পাঠ্যপুস্তকে পাইনিপণ্ডশ্রমছিল ফোরে আর ক্লাশ ফাইভে পেয়েছিলাম,ধনগোপাল মুখোপাধ্যায়ের, ‘চিত্রগ্রীবের ওড়ার শিক্ষা পোষা পায়রা চিত্রগ্রীবকে ছাদের কার্নিশে বসিয়ে বাবা মায়ের সেই ঠেলে দিয়ে ওড়া শেখানোর মধ্যেকার মেসেজটি আজও অনেকসময় সময় বেশ কাজে দেয়

বাবা,আজ ছাদে যাবে?’ ছেলের প্রশ্ন পড়তে পড়তেই 

-‘কেন রে?’

-‘পায়রাদের চাল খাওয়াব

উল্টো দিকের বাড়ির ছাদে এক দঙ্গল পায়রাকে সেই ওমরেশপুরি স্টাইলে দানা খাওয়াচ্ছিলেন এক  বর্ষীয়ান ছেলের এই সাধ হয়ত সে দৃশ্য দেখেই হঠাৎ উল্টোদিকের ছাদে  এক সঙ্গে সবকটা পায়রার উড়ে যাওয়ার শব্দ এল কী ব্যাপার? তাকিয়ে দেখি হুপ হুপ শব্দে ওখানে নেমে এসেছে এক দঙ্গল হনুমান

এদিকে একসঙ্গে পায়রা ওড়ার শব্দে আমি কিন্তু আঁতকে উঠেছি আমার চকিতে মনে পড়ে গিয়েছে, সত্যজিৎ রায়েরঅপরাজিতসিনেমায় হরিহরের সেই মৃত্যু দৃশ্য মনে হয়, কে যেন এক ফুঁয়ে নিভিয়ে দিল এতক্ষণের সব প্রসন্নতা এত বিষণ্নতার অন্য কারণও বুঝি আছে! আসলে,এই করোনায় কে  থাকবে,কে যাবে,সবই তো অনিশ্চিত    

সম্বিত ফেরে ছেলের কথায়-‘ছাদে আমরা যাব না বাবা?’     

-‘যাব, আজ না গেলে আর কবে যাব? আজ যে ১৩ জুন,ইন্টারন্যাশানাল পিজিয়ন ডেজোর করে তাড়াবার চেষ্টা করি যাবতীয় বিষণ্নতা

 

 


শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২০

চল পানসি (তাজমহল দর্শন)

ভ্রমণ    তাজমহল দর্শন       

                                                 

                                                          

 

 


তাজমহল দেখব, সাধ বহুদিনের সেবার পুজোর ছুটিতে লক্ষ্মীপুজো মিটতেই আমরা কয়েকজন  বেরিয়ে পড়েছিলাম আগ্রার উদ্দেশে শিয়ালদহ আজমির এক্সপ্রেসে টিকিট কিন্তু শুরুতেই বিধি বাম শিয়ালদহ থেকে  তে্রো ঘন্টা দেরি করে ছাড়ল ট্রেন তারপরও বিপদ কাটল না দেখলাম যে কোনও কারণেই হোক ট্রেনের গতি বেশ মন্থর ট্রেনের যাবার কথা ছিল গয়া হয়ে,কিন্তু রেলপথের কী গন্ডগোল, ট্রেন চলল পটনা হয়ে যখন আগ্রা পৌঁছলাম তখন ট্রেনের দেরির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে চব্বিশ ঘন্টা বিয়াল্লিশ  মিনিট চার জন বড়োর সঙ্গে দুটো শিশু একজন ছয়,একজন দুই এত বিলম্বেও কিন্তু ওরা কাবু হয়নি ছোটটির কাছে তো ট্রেনটা ওর ভাষায় হয়ে দাঁড়িয়েছিলট্রেনবাড়ি

হাতে সময় রয়েছেতাই একদিন দেরির জন্য আমরা বড়রাও খুব একটা বিচলিত হইনি এরকম তো হতেই পারে বলে মেনে নিয়েছি আগে থেকে হোটেল ঠিক ছিল রাত্রিটা হোটেলে কাটিয়ে,পরদিন বেরিয়ে পড়লাম তাজমহল দেখতে

হোটেল থেকে খুব বেশি দূর নয় অটোতেই পৌঁছে গেলাম তাজমহল লম্বা টিকিটের লাইন কিন্তু দ্রুতই মিলল টিকিট গাইড আগেই আমাদের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছিল এবার তাঁরই সূত্রে এল ফটোগ্রাফার গাইড বললেন,ফটো সব আগেই তুলে নিন তাহলে বেরোবার সময় নিয়ে বেরোতে পারবেন আমরা রাজি হলাম না যা দেখতে এসেছি তা না দেখে নিজেদের ফটো তোলায় মত্ত হবার ইচ্ছে আমাদের নেই ফটোগ্রাফার ফোন নম্বর দিয়ে বলে গেলেন,আমাদের সময় হলে তাঁকে যেন একবার খবর দেওয়া হয়অনুরোধ করলেন অন্য ফটোগ্রাফার না নেবার জন্য

গাইডের পিছু পিছু আমরা এগিয়ে চললামযে তাজমহল এতদিন দেখেছি ক্যালেন্ডারে, বইয়ের পাতায়, এখন সেই তাজমহলের একেবারে সামনেস্বপ্ন না বাস্তব! রোমাঞ্চ সারা শরীরে।

গাইড বোঝাচ্ছিলেন,কোথা থেকে কী পাথর আনা হয়েছিল,নির্মাণ কাজের জন্য কতগুলো হাতি লেগেছিল এবং কত শ্রমিক,কত সময় লেগেছিল তৈরি করতে ইত্যাদি খুঁটিনাটি তথ্য আমি  শুনছিলাম,আবার শুনছিলামও না আসলে তাজমহলের অপার্থিব সৌন্দর্যের সামনে দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝেই গাইডের কথা  থেকে ছিটকে যাচ্ছিলাম কয়েকশো বছর আগের এক পত্নীনিষ্ঠ বাদশাহের এই অসামান্য কীর্তি দেখে দলের অন্য সঙ্গীদেরও আমারই মত অবস্থা 

বাইরে থেকে কিনে নিয়েছিলাম পায়ে পরার প্লাস্টিক আবরণী। এবার জুতোর উপর তা চাপিয়ে উঠে পড়লাম তাজমহলের উন্মুক্ত আঙিনায়। পার্শ্বস্থ মসজিদটিকে এক ঝলক দেখে নিয়ে দাঁড়ালাম তাজমহলের সমাধিকক্ষের ভিতরে প্রবেশ করবার লাইনে।  একসময় ভিতরে প্রবেশ করলাম ভিতরে কিন্তু দু দন্ড দাঁড়ানোর সুযোগ নেই। চলতে চলতে দেখা,আবার দেখতে দেখতে চলা। ভিতরে ফটো তোলা বারণ। কিন্তু শুনছে কে? অনে্ককেই ওই অবস্থাতেও ছবি তোলার জন্য মোবাইল তাক করতে দেখা গেল।

সমাধিকক্ষ থেকে বেরোলাম। আবার বাইরের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ। নীচে যমুনা। কিন্তু একী করুণ অবস্থা তার! বন্দী অবস্থায় শোনা যায় শাজাহান এই যমুনার জলে তাজমহলের প্রতিবিম্ব দেখে বন্দীত্বের বেদনা কিছুটা প্রশমিত করতেন। সে-যমুনার পলিতে জর্জরিত হতশ্রী দশা দেখে খারাপ লাগছিল

নিচে নেমে প্লাস্টিকের আবরণী জুতো থেকে ছাড়িয়ে ফেলা হল আবর্জনা-পাত্রে চারবাগ বাগান আর  মাঝখানে উঁচু জলাধার সব জায়গাই ঘুরে ফিরে দেখলাম উঁচু জলাধারের সামনে লম্বা জলাধারে  তাজমহলের প্রতিবিম্ব একজন সে-ছবি মোবাইল-বন্দী করল কিন্তু  আমরা যে তাজমহলে এসেছিলাম তার কিছু পাথুরে প্রমাণও তো রেখে দিতে হবে তাজমহলকে সামনে পিছনে রেখে কিছু ছবি তোলা  হয়েছিল মোবাইলে আরও কিছু তোলা হল ফোনে ডাকা হল সেই ফটোগ্রাফারকে পাকা হাতে আমাদের কিছু ছবি তুলে দেবার জন্য

ফিরতে ইচ্ছে হচ্ছিল না তবু প্রেমের এই স্মৃতিসৌধ থেকে একসময় ফিরতেই হল ফেরার সময় বার বার মনে চলে আসছিল,রবীন্দ্রনাথের লেখা শা-জাহানকবিতার সেই অবিস্মরণীয় লাইনগুলি-‘এক বিন্দু নয়নের জল/কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বল/এ তাজমহল…’