মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২০

কথাঃ আবোলতাবোল ('বন্ধু বিনে প্রাণ বাঁচে না...')

কথাঃ আবোলতাবোল 

 


বন্ধু বিনে প্রাণ বাঁচে না



অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলে,ধরতে একটু বাধো বাধো ঠেকেই তবু না ধরেও পারা যায় না কারণ অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলে শুধু বিরক্তিকর অভিজ্ঞতাই হয় না,অনেক গুরুত্বপূর্ণ খবরও মাঝেসাঝে মিলে যায়

লকডাউনের বাজারে সেদিন সন্ধেয় একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন এল ইতস্তত করে ধরে যেই বলেছিহ্যালো’,অমনি একটা জড়ানো কাঁপা-কাঁপা পুরুষ গলার আবৃত্তি-‘জীবন গিয়াছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার…’রং নাম্বারবলে কাটতে যাব ফোনটা,এমন সময় ওই জড়ানো কন্ঠ বলে ওঠে-‘চিনতে পারলি  না!আমি দীপ্তেন্দু,-নবীন ফেসবুক থেকে ফোননম্বর  যোগাড় করে  ফোন করছি 

মুহূর্তেই হু হু করে ছুটে চলে এল বাল্যকাল ;‘হরিহর আত্মাদুই কিশোরের বন্ধুত্ব খুলে গেল হৃদয়ের  উদারা-মুদারা কে যেন বলেছিল, বন্ধুত্বের চেয়ে বড় প্রেম আর নেই মনে হল কথাটা মিথ্যে নয়

যাঁরা একেলা জগৎ ভুলে পড়ে থাকেন আপন সংসার-কূলে,তাঁদের কথা আলাদা কিন্তু গড়পড়তা বেশিরভাগ মানুষেরই ,পরিবার,আত্মীয়স্বজন যতই থাক বাইরের পৃথিবীটা চিনতে জানতে সর্বোপরি বেশ কিছু অনুভূতি শেয়ার করতে বন্ধু ছাড়া চলে কি!

হয়ত এ সম্পর্কও কখনও প্রতারণার ফাঁদ  পাতে ঈর্ষায় জর্জরিত হয় লোভের খপ্পরে পড়ে অনেকসময়  চলে আসে ছুরি,রিভালবারও তবু বন্ধুত্বের বন্ধন এড়াবে কে?

বন্ধুত্ব আমাদের অনেকের কাছেই বড় মায়ায় গড়া শব্দ তাই একে খুন হতে দেখলে বুকে বাজে যে  কোনও সম্পর্কের মত এখানেও টানাপোড়েন থাকতে পারে। কিছু ঈর্ষার কাঁটা, কিছু সন্দেহের তীর, উত্তরজীবনে আর্থিক অসাম্য জনিত কিছু উপেক্ষার চাহনি এসে একে বিব্রতও করতে পারে কখনওসখনও, কিন্তু উপসংহার  কোনও একজনের মৃত্যু দিয়ে  শেষ হলে তা  খুবই পরিতাপের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়

অল্পবয়সের বন্ধুত্ব যদি দুজনেরই জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যায় তাহলে সে-বন্ধুত্ব ঘিরে সমস্যা আসা নতুন কিছু নয় আমাদের সাহিত্যে এর অনেক উদাহরণ রয়েছে রবীন্দ্রনাথের চোখের  বালিতে বিনোদিনীকে  ঘিরে মহেন্দ্র আর বিহারীর বন্ধুত্বের কথাই ধরা যাক মহেন্দ্র আর বিহারীর বন্ধুত্বের সম্পর্ক তো মাঝে মাঝেই ঠোক্কর খেয়েছে দু বন্ধুর মধ্যে দূরত্বও তৈরি হয়েছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুই বন্ধুর আশৈশব অটল বন্ধুত্বের মহামূল্যই স্বীকৃত হয়েছে মহেন্দ্রর উপলব্ধির মাধ্যমে  

গোরাতে গোরা বিনয়ের বন্ধুত্বেও টানাপোড়েন এসেছে তবেচোখের বালি মত কোনও ত্রিকোণ  সমস্যাজনিত টানাপোড়েন নয়এখানে দুই বন্ধুর সাময়িক দূরত্ব তৈরি হয়েছে দুজনের আদর্শ ঘিরে কিন্তু বন্ধুত্ব তা বলে হারিয়ে যায়নি উপন্যাসের শেষই হয়েছে আনন্দময়ীর এই উক্তি দিয়ে-‘গোরা,এইবার একবার বিনয়কে ডেকে পাঠাই

রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসে টিকে থাকা বন্ধুত্ব আরও আছেযেমনচতুরঙ্গ শচীশ,শ্রীবিলাস বন্ধুত্ব অবশ্য শৈশবে গড়া নয় বিএ পড়তে এসে শ্রীবিলাস শচীশের বন্ধুত্বে বাঁধা পড়েমাঝখানে দামিনী সংযোগে এখানেও একটা ত্রিকোণ প্রেমের আবহ তৈরি হয় কিন্তু বন্ধুত্ব বধ্যভূমিতে যায় না,বরং রক্ষিত হয় অশেষ গরিমায়

 আদর্শ বন্ধুত্ব বলতে যা বুঝি বাংলাসাহিত্যে তাও নেহাৎ কম নেই এর মধ্যে সেরা হবার মত বন্ধুত্বটি সম্ভবত রচনা করে গেছেন শরৎচন্দ্র ইন্দ্রনাথ-শ্রীকান্তের বন্ধুত্ব এই বন্ধুত্ব ছেলেবেলায় আমাদের কাকে না  উত্তেজিত,উদ্বুদ্ধ করেছে! এখানে কোনও টানাপোড়েন নেই,কোনও অশুভ ছায়াপাত নেই,বন্ধুত্ব এখানে যথার্থই প্রেমে পর্যবসিত ইন্দ্রনাথের দুঃসাহসিক অভিযান,মানবিক কর্মকান্ডের শ্রীকান্ত শুধু সঙ্গী নয়, মুগ্ধ দর্শকও তাই হয়তো সেসবের বর্ণনা চিরকালের মত গেঁথে গেছে আমাদের মনে   

পথের পাঁচালী অপু-পটু জুটির যাত্রা ইন্দ্রনাথ-শ্রীকান্তের মতই কৈশোরের বাঁকে থেমে গেছে কিন্তু এই বন্ধুত্বও যতটুকু পাতা জুড়ে,সবটুকুই মধুরতায় ভরা হয়ত এই বন্ধুজুটি বাংলাসাহিত্যে তত বিখ্যাত নয়,  কিন্তু   মনে রাখার মত তো বটেই মালিন্যহীন এই বন্ধুত্ব অপুর নিশ্চিন্দিপুর ছাড়ার পরে একদা মামজোয়ানের মেলায় চকিতে  ফিরে এসে অচিরকালের মধ্যেই আবার দূরে চলে যায় আমাদের অনেক দূরে যাওয়া-সরে যাওয়া বন্ধুত্বের মতই    

আসলে বন্ধু কেউ থাকে,কেউ চলে যায়,আবার নতুন বন্ধু এসে যোগও দেয় জীবনের স্রোতে এটাই নিয়ম আর এখন তো সোস্যাল মিডিয়ার যুগ এতে একবার প্রবেশ করলে অজস্র বন্ধুর হাতছানি বন্ধু নিয়ে একসময় আমাদের উপর পরিবারের নানা নিষেধাজ্ঞা থাকে এর সঙ্গে মেশা যাবে না,ওর সঙ্গে কম মিশবে ইত্যাদি গড়ে বেড়ে ওঠার বয়সে বন্ধু নির্বাচনে সাবধান করে দেওয়াটা অভিভাবকদের অন্যায় নয় কিন্তু পরিণত বয়সে কে সাবধান করবে? অথচ সোস্যাল মিডিয়ায় বন্ধুর ছদ্মবেশে অনেকসময় এসে  হাজির হয় প্রতারক মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ,একথা মেনে নিয়েও বলা যায়, ভার্চুয়াল বন্ধুত্বে আস্থা রাখার আগে একটু যাচিয়ে নেওয়া দরকার

তবে বিপদ যে শুধু এখানেই ওৎ পেতে আছে তা তো নয় অস্থিরতা একালের যুগধর্ম আর তাছাড়া সাহিত্য নামক যে যাদুকাঠির ছোঁয়ায় মন প্রসারিত হয়, আসে জীবনকে জানার সেই পিপাসা যাতে ভর করে মানুষ হাত বাড়ায় একে অপরের দিকে,তা এখন প্রায় নেই বললেই চলে হয়ত কারণেই  অল্পবয়সের বন্ধুত্বেও এখন সামান্য কারণে ভুল বোঝাবুঝি চলে  আসে এবং বন্ধুত্ব কখনও বিধ্বংসী আকারও নিয়ে নেয়  

আমরা সৌভাগ্যবানআমাদের সাহিত্য ছিলজীবন ঘিরে আমাদের তেমন অস্থিরতাও ছিল না জানি না সেসব কারণে কিনা,বৃহত্তর জীবনের ডাকে হারিয়ে যাওয়া বন্ধুত্ব,বহু বছর পরে ফোনে ফিরে পেয়ে সেদিন হৃদয়ের রক্তক্ষরণ চলে প্রান্তে প্রান্তের আবেগ বুঝিয়ে দেয়, একই অবস্থা ওখানেও

 

 


সোমবার, ৮ জুন, ২০২০

কথাঃআবোলতাবোল ('যতই নাগরিক হও,জীবনের কোথাও না কোথাও লুকিয়ে রাখ একটা গ্রাম')

কথাঃ আবোলতাবোল 


'যতই নাগরিক হও জীবনের কোথাও না কোথাও লুকিয়ে রাখ একটা গ্রাম।'
পুরনো ডায়েরির পাতা ওল্টাতে  গিয়ে আজ হঠাৎ নজরে পড়ল লাইনটা।কী লিখতে গিয়েছিলাম? গদ্য না কবিতা? এক লাইনের পর লেখাটা যে মুখ থুবড়ে পড়েছিল,সে তো বুঝতেই পারছি। কিন্তু কথাটা আজও মানি কি? লুকিয়ে থাকা গ্রামটার জন্য সুবিধা অসুবিধা দুইই আমাকে পোহাতে হয়েছে,এখনও হয়। সুবিধার কথা আগে বলি। গ্রামটা ছিল বলে আজও পাঁচ কিমি রাস্তা অনায়াসে হাঁটতে পারি। রাস্তার ধারের ইট পাতা সেলুনে চুল ছাঁটানোর জন্য বসতে পারি নির্দ্বিধায়। দূরপাল্লার একক রেলযাত্রায় রিজার্ভেশন না পেলেও 'কী হবে' 'কী হবে' না করে বেরিয়ে পড়তে পারি। কিন্তু  ভেবে দেখেছি এসব সুবিধা খুব বড় কিছু নয়। তুলনায়  অসুবিধেগুলো অনেক বেশি। গ্রামটা আমার সঙ্গে লেপটে থেকে কিছুতেই আমাকে স্মার্ট হতে দেয় না। হতে দেয় না চালাক চতুর। যাঁর সঙ্গে ভাব হয় আগেপিছে না ভেবে বলে ফেলি নিজের সব কথা,যা পরে অনেক সময় সামলানো কঠিন হয়।এসব কি এযুগে কম অসুবিধার! তবু গা ঝাড়া দিয়ে গ্রামটাকে ঠেলব  সে উপায় নেই। একে তো এতদিন ধরে নিয়ে চলার অভ্যেস। তার উপর ওই,লেখার ভূতটা।রাত্রে লেখার টেবিলে যখন বসি তখন এক কোনে ঠাঁই বসে গ্রামটা আজও যোগান দিয়ে চলে, চিত্র,চরিত্র। আমাকে বিষয়সন্ধানে পথে নামতে হয় না,পথে বসতেও নয়। সেসব কতটুকু শিল্প হয় সে অবশ্য অন্য কথা।

কথাঃআবোলতাবোল (ফেসবুক ও আমি)

কথাঃআবোলতাবোল


ফেসবুকের দৌলতে আমার ভার্চুয়াল বন্ধুর সংখ্যা এখন হাজার ছুঁই ছুঁই। আমার ফেসবুকের বন্ধুরা অন্য সবার মতই,দুই ক্যাটাগরির। এক,আমি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে যাঁদের বন্ধু হয়েছি। দুই আমাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে যাঁরা বন্ধু হিসাবে আমার সঙ্গে জুড়েছেন। প্রথম ক্যাটাগরির বেশিরভাগের সঙ্গে আমার সম্পর্ক অনেক দূরের। এঁরা অনেকে 'জুকারবার্গের যৌথ খামারে'(ঋণঃ গৌরব বিশ্বাস) আমাকে নিয়েছেন  মূলত তাঁদের পোস্টে লাইক,কমেন্টস এর প্রত্যাশায়। খুব স্বাভাবিকভাবেই কিছুদিন এঁদের কারও পোস্টে এসব না দিলে তিনি কখনও চুপিসাড়ে আনফ্রেন্ড করে দেন। আবার কখনও, কেউ  যখন হুমকি ছোড়েন,নিষ্ক্রিয় থাকলে আনফ্রেন্ড করার,ভয়ে ভয়ে আমিই সরে যাই। আর দ্বিতীয় দল আমাকে চেনেন, অনেককে আমিও চিনি,আর আমি যেহেতু লাইক কমেন্টস এর জন্য এঁদের পাঠানো বন্ধুত্বে বাঁধা পড়িনি,তাই এঁদের সঙ্গে চলতে অসুবিধে হয় না। তবু এঁদের মধ্যে কেউ কেউ বাজে কোনও ছবি বা উস্কানিমূলক পোস্টে যখন আমাকে ট্যাগ করেন অস্বস্তিতে পড়ে যাই। ভার্চুয়াল বন্ধুত্বের এই প্ল্যাটফর্মে তবু কিছুটা সময় মুখ ডুবিয়ে বসতে খারাপ লাগে না। কাছের দূরের বন্ধুদের কথায় আলোকিত হই,আন্দোলিত হই,আমোদিত হই। প্রতিদিনের রোজনামচায় এভাবে ফেসবুক কিছুটা হলেও সুরভি ছড়িয়ে  যায়। তবে এত করেও ফেসবুকের কপালে কিন্তু গঞ্জনাই জোটে। ব্যবহারিক জীবনে আমার মত অমিশুকেরাও যেখান থেকে রোজ অক্সিজেন নেয়, সুযোগ পেলে তাকেই গালাগালি করে তেড়ে এবং নিজের ফেসবুক সংসর্গের কথা অন্যলোকের কাছে স্বীকার করতেও কুণ্ঠিত হয়।

কথাঃআবোলতাবোল ('এ দীনতা তোমায় মানায় না রাজাধিরাজ')

কথাঃ আবোলতাবোল


পড়াশোনায় খারাপ ছেলে হিসাবে তখন আমি রীতিমত বিখ্যাত।ভুগি হীনমন্যতায়ও। অথচ পড়াশোনাতে মনোযোগীও হতে পারি না।সুতরাং সারাদিন বাড়িতে গঞ্জনা। সঙ্গে উপদেশ, নীলুর মত হতে পার না, নীলুকে দেখে শেখো। একই ক্লাশে পড়া নীলু তখন আমার কাছে বিষ্ময়কর এক প্রতিভা। পরীক্ষায় সব বিষয়ে ফুলমার্কস, অথবা ফুলমার্কসের কাছাকাছি পায়। নীলুর কাছে ঘেঁষতেই ভয় পাই। ক্লাস সিক্সের বার্ষিক পরীক্ষায় আমার সিট পড়ল নীলুর পিছনে। পরীক্ষা বলে কথা! এতদিন কাছে ঘেঁষতে না পারার সংকোচ ফেল করার ভয়ে উবে গেল। অঙ্ক পরীক্ষায় তো বারবারই ওকে খোঁচাতে লাগলাম খাতা দেখানোর জন্য। নীলু স্যারকে নালিশ করে আমার সিট বদলে দিল। শুধু তাই নয়। পরীক্ষার পর বাইরে বেরিয়ে আমাকে ডাকল কাছে। তারপর পরীক্ষায় উত্যক্ত করার অপরাধে সোজা গালে বসিয়ে দিল এক থাপ্পড়। থাপ্পড় খেয়েই কিনা জানি না,এরপর আমার পড়াশোনার গ্রাফ ক্রমেই উর্ধ্বমুখী হতে লাগল। আর আশ্চর্যজনকভাবে নীলুর পড়াশোনা, রেজাল্টের গ্রাফ নামতে লাগল নিচে। শুনলাম,বখে গেছে নীলু। এরপর ক্লাশ নাইন। আমি তখন ক্লাশে দুই। আর নীলু দশেরও বাইরে। সেদিন কোথায় যেন নীলু যাবে ওর দিদির সঙ্গে। বসেছিল,আমাদের গ্রাম সংলগ্ন স্টেশনের নিচে,নিমগাছটার তলায়। এগিয়ে গেলাম। সামনে বার্ষিক পরীক্ষা। হঠাৎ নীলু ওর দিদির আড়ালে আমাকে জিজ্ঞেস করল, পাটিগণিতের কোন কোন অঙ্কগুলো ইমপর্টেন্ট রে? আমি উত্তর দেব কী, ওর প্রশ্ন শুনেই চোখ সজল। মনে হল বলি,এ দীনতা তোমায় মানায় না রাজাধিরাজ! ঠিক এমনই অবস্থা হয়েছিল,সহকর্মী এক শ্রদ্ধেয় দাদাকে দেখে। উনি সব বিষয়েই ছিলেন পারঙ্গম। শারীরিকভাবে তখন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন,সে অসুস্থতা কিছুটা বোধহয় ছাপ ফেলেছিল তাঁর চিন্তাক্ষমতাতেও। মেয়ে পড়ে ক্লাশ এইটে। আমি এইটের অঙ্ক নিই। তাই সেদিন আমাকেই বাড়িয়ে দিলেন,মেয়ের না করতে পারা একটা অঙ্ক। ইংরেজির শিক্ষক হলেও যে অঙ্ক উনি করতে পারতেন বাঁহাতে,সেটা উনি আমাকে দিচ্ছেন করতে! আমার মনে হল, আবার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে নীলু। নীলু বাঁচেনি।মাধ্যমিক দেওয়ার পরেই মারা গিয়েছিল ব্রেন টিউমারে। তখন শুনেছিলাম,নীলুর অমনোযগিতা কিছুটা নাকি ছিল ওই রোগের কারণেই। বাঁচেননি সহকর্মী দাদাটিও। মৃত্যুর আগে দুই জীবনের এই পরাভব আমার কাছে আজ রয়ে গেছে কষ্টদায়ক স্মৃতি হয়ে।

 

কথাঃআবোলতাবোল (বক্তা প্রচুর,শ্রোতা কম)

কথাঃআবোলতাবোল 



এক স্নেহভাজন তাঁর একটা ভ্রমণকাহিনিতে এক জায়গার গুরুত্ব বোঝাতে লিখেছিল,' অনেকেই হয়ত জানেন না...' জাতীয়  শব্দবন্ধ। ওকে বলেছিলাম,তুমি লেখার আগেই কীভাবে ধরে নিলে,যা লিখছ তা অনেকে জানে না? তুমি কি সার্ভে করেছ,নাকি অনুমান? বলার অপেক্ষা রাখে না,অনুজটি ওই ধরণের শব্দবন্ধ আর কখনও লেখায় ব্যবহার করেনি। এই সব লেখার ত্রুটি সব সময় আমরা সচেতনভাবে যে করি তা কিন্তু নয়। পূর্বসূরী কারও লেখার প্রভাব থেকেও হয়। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী সম্পাদিত 'বাংলা কী লিখিবেন,কেন লিখিবেন'এ 'বলাই বাহুল্য' ব্যবহার নিয়ে বেশ কটাক্ষ রয়েছে। 'বাহুল্যই যদি তবে বলা কেন?' এটা পড়ার পর প্রতিবার এই শব্দবন্ধ ব্যবহারের আগে আমি ভেবে নিই একবার। ঠিক এমন সমস্যা গল্পে আপনি তুমি ব্যবহার নিয়েও হয়।'বাবা বললেন' লেখা হয়ত ঠিক। কিন্তু অনেকসময় লিখতে গিয়ে,মনে হয় 'বললেন'এ বাবা কে কেমন দূর দূর মনে হচ্ছে। তবু বাবা নিজের লোক। তুমি লেখাই যায়। কিন্তু রিকশাওয়ালা গল্পের নায়কের থেকে বয়সে ছোট হলেও 'তুমি' লেখা মুশকিল। পাশ থেকে কেউ কান মলে দিয়ে বলবে,'ও রিকশাওলা,তাই বুঝি আপনি নয়!' এতো গেল লেখার কথা। কথা বলতে গিয়েও দেখেছি অনেক সমস্যা। বক্তা প্রচুর,শ্রোতা কম। তর্কপ্রিয় কেউ কেউ আবার ততটুকুই শোনেন যতটুকু তাঁর ডিবেট করতে লাগে। কারও কারও কথা বলার ধরণ হল, অভিযোগ অথবা দোষ দিয়ে দিয়ে। কেউ কেউ আবার কথা শুরুই করেন, 'ভুল করছেন' শব্দবন্ধে,এমনকী আপনি যদি বলেন বেগুনগাছে বেগুন হয় তবু্ও। আর এঁদের যুক্তিরও এত জোর, দেখেছি ঠিক প্রমাণও করে দেন যে বেগুনগাছে বেগুন হয় কথাটা ভুল ছিল একেবারে। ফলে যা হয়, আমার মত কমজ্ঞানী, যুক্তিদুর্বল প্রকাশ্যে মুখ খোলারই সাহস পায় না।

কথাঃআবোলতাবোল ('কী' আর 'কে')

কথাঃআবোলতাবোল

'কী'আর 'কে' এই দুইয়ের মধ্যে লড়াই নতুন নয়। দু একজন গোঁয়ার লোক থাকেন,যাঁরা কিছুতেই 'কী'এর পক্ষ ছেড়ে 'কে'র দিকে যাবেন না। কিন্তু এ সমাজে তাঁরা সংখ্যালঘু। সমাজ সাধারণভাবে 'কে'র দিকে। যেজন্য আপনি যতই ভাল সাহিত্য বুঝুন,সিনেমা বুঝুন,রাজনীতি বুঝুন সমাজ আগে দেখে নেবে আপনি কে,আপনার স্ট্যাটাস কী,আপনার বাজারদর কেমন। এগুলো জুতসই হলে তবে সমাজের কানের দরজা ফাঁক হবে। দুখীরামের কথা ধরা যাক। দুখীরাম দিনমজুর। তাঁর দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না। কিন্তু সেই দুখীরাম একদিন লটারি পেয়ে গেল হঠাৎ। গ্রামের কোনও বিচার সভায় যে দুখীরামের উপস্থিতি কেউ এতদিন নজরও করত না,লটারি পাবার পরে সেখানে হাজির হতে দেখা গেল,তাঁর খাতিরই আলাদা। 'এ ব্যাপারে দুখীরাম তোমার কী মত?'বিচারসভার কর্তাব্যক্তিরা আলোচনার মাঝখানেই তাকালেন দুখীরামের দিকে। ঠিক উল্টো অবস্থা হয়েছিল অপুর। লীলাদের বাড়ির পার্টিতে গিয়ে গণ্যমান্যদের আলোচনাসভায় যেই অপু  নিজের মত প্রকাশ করতে গেছে, অমনি 'একজন বাধা দিয়া কহিল-মশায় কি করেন,জানতে পারি কি?'একসময় যখন আমার পরিচয় সবাই জানত টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার,দেখেছি সাধারণ কথাও অনেক সময় কলকে পেয়ে যেত। স্কুল শিক্ষকের পরিচয়ে এসে দেখছি,সে ক্যারিশমা গেছে। সমাজ শিক্ষকের কথা যত না শোনে,ভুল ধরে তার চাইতে অনেক বেশি।লেখার ক্ষেত্রেও এই কী আর কে খুব গুরুত্বপূর্ণ। বড় কাগজ অনেকসময় কী দেখে,কে নয়। কিন্তু ছোট কাগজের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময়ে কে টাই প্রাধান্য পায়। বড় কাগজে মুখ দেখানো থাকলে ছোট কাগজ কী টা আর যাই হোক না পড়ে বাতিল করে না। এ অবশ্য আমার অভিজ্ঞতা, সবার সঙ্গে নাও মিলতে পারে। তবে কী আর কে এই দুইই যখন দেখবার মত,তখন অবশ্য বলার কিছু থাকে না। কিন্তু কী কিছুই নয়,কে দিয়ে বাজিমাত,এ যথেষ্ট পীড়াদায়ক।